চিনা হাঁস (Muscovy Duck) পালন বর্তমানে একটি লাভজনক ব্যবসা। তবে চিনা হাঁসের খামার সফল করতে হলে এর বাচ্চার প্রাথমিক পরিচর্যা বা ব্রুডিং অত্যন্ত সতর্কতার সাথে করতে হয়। আজ আমরা জানবো চিনা হাঁসের বাচ্চা ফুটার প্রথম দিন থেকে ডিম পাড়ার বয়স পর্যন্ত সম্পূর্ণ পালন পদ্ধতি.
বাচ্চার প্রাথমিক খাবার ও পানির ব্যবস্থাপনা (১ম দিন) :-
প্রথম পানি পরিবেশন : বাচ্চা ফোটার ২৪ থেকে ৪০ ঘণ্টার মধ্যে প্রথম খাবার পানি দিতে হবে। প্রথমবার পানি দেওয়ার সময় পানির সাথে
লাইসুভিট (Lysovit) অথবা লেবুর রস এবং চিনি/গ্লুকোজ মিশিয়ে দিতে পারেন। এটি বাচ্চার শরীরের ধকল ও ক্লান্তি দূর করে।
পানি খাওয়ানোর কৌশল : ছোট অবস্থায় বাচ্চারা নিজে নিজে পানি খেতে পারে না। তাই প্রথমবার প্রতিটি বাচ্চাকে ধরে ধরে পানির পাত্রে ঠোঁট চুবিয়ে পানি খাওয়ানো শিখিয়ে দিতে হবে।
প্রথম খাবার (স্টার্টার ফিড) : পানি দেওয়ার ২০-৩০ মিনিট পর প্রথম খাবার দিন। প্রথম খাবার হিসেবে
বয়লার স্টার্টার বা সোনালী স্টার্টার ফিড দেওয়া সবচেয়ে ভালো, এতে বাচ্চার গ্রোথ দ্রুত হয়।
খাবার দেওয়ার নিয়ম : যেখানে খাবার দিবেন, সেখানে পাটের বস্তা, কাপড় বা মোটা পেপার বিছিয়ে তার ওপর খাবার ছিটিয়ে দিন। ভুলেও বাচ্চার নিচে কোনো পিচ্ছিল প্লাস্টিক বা পলিথিন বিছাবেন না, এতে বাচ্চার পা বাঁকা হয়ে যেতে পারে।
ব্রুডিং ও প্রথম সপ্তাহের পরিচর্যা :-
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি : প্রথম ৩-৪ দিন পানির সাথে লাইসুভিট খাওয়ালে বাচ্চার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
সতর্ক সতর্ক পানি দেওয়া : পানি দেওয়ার সময় খেয়াল রাখবেন যেন বাচ্চার শরীর ভিজে না যায়। শরীর ভিজলে দ্রুত ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হতে পারে। এজন্য বাচ্চার জন্য তৈরি বিশেষ
ড্রিংকার বা ন্যারো পানির পাত্র ব্যবহার করুন।
ঠান্ডার আগাম ডোজ : বাচ্চার বয়স ৫-৬ দিন হলে ঠান্ডা প্রতিরোধে
এনরোসিন ভেট (Enrocin Vet) বা সমমানের অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে একটি কোর্স করিয়ে নিবেন। ১ মিলি ওষুধ ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে টানা ৩-৪ দিন খাওয়াবেন। চিনা হাঁসের বাচ্চাকে ছোটবেলায় ঠান্ডা থেকে বাঁচাতে না পারলে মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে যায়।
ব্রুডিং করার নিয়ম : যদি ১০টির বেশি বাচ্চা হয়, তবে অবশ্যই কৃত্রিম আলোর মাধ্যমে ব্রুডিং (তাপ দেওয়া) করতে হবে।
শীতে ১০-১২ দিন এবং
গরমে ৭-৮ দিন ব্রুডিং করা প্রয়োজন।
২য় থেকে ৪র্থ সপ্তাহের পুষ্টি ও যত্ন (ভিটামিন কোর্স) :-
পা ও ঘাড় বাঁকা রোগ প্রতিরোধ : বাচ্চার বয়স ১০-১১ দিন হলে
থায়াবিন (ভিটামিন বি১ ও বি২) খাওয়াতে হবে। এটি হাঁসের ঘাড় বাঁকা এবং পা অবশ (প্যারালাইসিস) হওয়া প্রতিরোধ করে। ১ গ্রাম পাউডার ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩-৪ দিন খাওয়াবেন।
রুচি ও শারীরিক বৃদ্ধি : বাচ্চার বয়স ১৪-১৫ দিন হলে
জিংক (Zinc) সিরাপ খাওয়াতে হবে। এটি হাঁসের খাবারের রুচি বাড়ায় এবং দ্রুত বড় হতে সাহায্য করে। ১ মিলি জিংক ১ লিটার পানিতে মিশিয়ে ৩-৪ দিন খাওয়াবেন।
পানির সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা : বাচ্চার বয়স
১ মাস না হওয়া পর্যন্ত কোনোভাবেই পানিতে বা পুকুরে ছাড়বেন না। কারণ এই বয়সে তাদের পালক পানি নিরোধক হয় না।
১ মাসের খাদ্য তালিকা : প্রথম ১ মাস পর্যন্ত চিনা হাঁসের বাচ্চাকে শুধুমাত্র
সোনালী স্টার্টার বা বয়লার স্টার্টার ফিড খাওয়াবেন।
১ মাস থেকে ডিম পাড়ার বয়স পর্যন্ত ব্যবস্থাপনা :-
মিশ্র খাবার শুরু : ১ মাস বয়সের পর থেকে স্টার্টার ফিডের পাশাপাশি দানাদার মিশ্র খাবার, চালের কুঁড়া, গম ভাঙা এবং প্রচুর পরিমাণে
সবুজ ঘাস বা কলমি শাক দিতে পারেন।
কৃমিনাশক কোর্স : হাঁসের বয়স
৩ মাস পূর্ণ হলে অবশ্যই প্রথমবার কৃমির ডোজ (Deworming) করাতে হবে। কৃমির ওষুধ দেওয়ার পরদিন লিভার টনিক খাওয়াতে ভুলবেন না। এরপর প্রতি ৩ মাস পর পর নিয়মিত কৃমির ওষুধ দিতে হবে。
ডিম পাড়ার প্রস্তুতি : হাঁসের বয়স ৪ মাস হলে এবং ডিম পাড়ার ১ মাস আগে থেকে
লেয়ার লেয়ার-১ (Layer-1) ফিড দেওয়া শুরু করুন। এতে হাঁস খুব দ্রুত এবং সুস্থভাবে ডিমে আসবে।
চিনা হাঁসের ভ্যাকসিন বা টিকাদান কর্মসূচি :-
১ম ডোজ (ডাক প্লেগ) : বাচ্চার বয়স
১ মাস (৩০ দিন) হলে ডাক প্লেগ ভ্যাকসিন করাবেন ১ম ডোজ।
২য় ডোজ (ডাক প্লেগ) : বাচ্চার বয়স
৪৫ দিন হলে ডাক প্লেগ ভ্যাকসিনের ২য় ডোজ বা বুস্টার ডোজ করাবেন।
৩য় ডোজ (ডাক কলেরা) : বাচ্চার বয়স
৬০ দিন (২ মাস) হলে ডাক কলেরা ভ্যাকসিন করাবেন ১ম ডোজ।
৪র্থ ডোজ (ডাক কলেরা) : বাচ্চার বয়স
৭৫ দিন হলে ডাক কলেরা ভ্যাকসিনের ২য় ডোজ বা বুস্টার ডোজ করাবেন।
পরবর্তী নিয়মিত নিয়ম : এরপর থেকে প্রতি
৬ মাস পর পর ডাক প্লেগ ও ডাক কলেরা ভ্যাকসিন নিয়মিত দিতে হবে।
নিয়মিত এমন গুরুত্বপূর্ণ খামার বিষয়ক পরামর্শ পেতে আমাদের ওয়েবসাইট
farmerkamol.com ভিজিট করুন এবং আমাদের ফেসবুক
Farmer Kamol পেজটি ফলো দিয়ে সাথেই থাকুন।
ট্যাগস: #চিনা_হাঁস #হাঁস_পালন #খামার_ব্যবস্থাপনা #farmer-kamol